চিলমারী নদীবন্দর; বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও যাত্রীসেবা একেবারেই শূন্য
চিলমারী নদীবন্দর; বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও যাত্রীসেবা একেবারেই শূন্য
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলা নদীবন্দর পুরোনো জৌলুস হারিয়েছে। তবে বন্দরটির গুরুত্ব এখনও কমেনি। প্রতিদিন রৌমারী উপজেলা, রাজীবপুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার হাজারো যাত্রী এই বন্দর ব্যবহার করেন। বিপুল সংখ্যক মানুষের আনাগোনা সত্ত্বেও চিলমারী বন্দরে একটি গণশৌচাগার নেই। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় নদীপথ পাড়ি দিয়ে বন্দরে নামার পর প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে গিয়ে নাজেহাল হতে হচ্ছে।
এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন নারী ও বৃদ্ধরা। যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রৌমারী উপজেলা, রাজীবপুর উপজেলা ও বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে নৌকায় চিলমারী নদীবন্দরে পৌঁছাতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিয়ে ঘাটে পৌঁছানোর পর জরুরি প্রয়োজনে কোনো শৌচাগার না থাকায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। অনেকে বাধ্য হয়ে আশপাশের বাসাবাড়িতে গিয়ে শৌচাগার ব্যবহারের অনুরোধ করেন। আবার লোকলজ্জার কারণে কেউ কেউ নদীর পারে খোলা জায়গায় প্রয়োজন সারতে বাধ্য হন। যাত্রীদের এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিতে সীমাবদ্ধ নেই, তৈরি করছে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিও। খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগের কারণে ব্রহ্মপুত্রের তীর ও আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি। নিয়মিত এই নৌপথ ব্যবহারকারী মোঃ শাহ্ মোমেন বলেন, ‘রৌমারী উপজেলা ও রাজিবপুর উপজেলা যেতে নৌকায় দীর্ঘ সময় লাগে। ঘাটে এসে শৌচাগার দরকার হলে আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। এখানে একটি গণশৌচাগার থাকা খুবই জরুরি।’ নারী ও শিশুদের ভোগান্তি আরও বেশি।
মোছাঃ শামসুন্নাহার বেগম নামের এক নারী যাত্রী বলেন, ‘পুরুষরা যে কোনোভাবে বাইরে কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টদায়ক। ঘাটে নেমে শৌচাগার না থাকায় দীর্ঘক্ষণ চাপ সহ্য করে থাকতে হয়, নতুবা অপরিচিত মানুষের বাড়িতে যেতে হয়।’ স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে চিলমারী নদীবন্দর ঘাটটি এক কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায় হলেও বন্দরে ন্যূনতম যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চিলমারী বন্দর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০টি নৌকা চলাচল করে। প্রতিটি নৌকায় গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকেন। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই ঘাট ব্যবহার করেন। চিলমারী নদীবন্দরের রমনা ঘাট মাস্টার মোঃ সিদ্দিক বলেন, ‘ঘাট থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও যাত্রীসেবা একেবারেই শূন্য। নদীবন্দরে গণশৌচাগার স্থাপনের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’ চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জনসমাগমপূর্ণ নদীবন্দরে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় ও বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত নিরাপদ শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা জরুরি।’ এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প পাঁচ বছর ধরে চললেও বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৪ শতাংশ। দীর্ঘদিন উন্নয়নকাজ চললেও ঘাটে যাত্রীসেবার মৌলিক সুবিধা বাড়েনি।
স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাবে গণশৌচাগারের পাশাপাশি যাত্রীদের বসার ছাউনি ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র বলেন, ‘আপাতত আলাদা গণশৌচাগার নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ইতোমধ্যে বন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেটি নির্মাণকাজ শেষ হলে টার্মিনালটি যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে, তখন আর এই সমস্যা থাকবে না।’
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স